প্রতিবেদকঃ
প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যার প্রধান
আসামি পুরস্কার ঘোষিত জঙ্গী সিফাত ওরফে
শামীম ওরফে মঈনুল ইসলাম টঙ্গী থেকে
পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। তাকে ছয়
দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। দীপনসহ
অনেক ব্লগার, লেখক হত্যার মাস্টারমাইন্ড
সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর জিয়া। তাকে
ধরিয়ে দিতে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা
করেছে পুলিশ। এছাড়া একই দিনে র্যাবের হাতে
গ্রেফতার হয়েছে কানাডা ফেরত জঙ্গী
রোজসহ জেএমবির নারী শাখার পুরুষ জঙ্গীসহ
তিন জন। তারা সুইসাইডাল স্কোয়াডের সদস্য। তাদের
কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার
হয়েছে।
গত ২৩ আগস্ট রাতে গাজীপুর জেলার টঙ্গীর
চেরাগ আলী মার্কেটের সামনে থেকে
প্রকাশক দীপন হত্যা মামলার মূল আসামি মইনুল হাসান
শামীম ওরফে সিফাত ওরেফে সামির ওরফে
ইমরানকে গ্রেফতার করে পুলিশের কাউন্টার
টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট।
বুধবার ডিএমপির মিডিয়া বিভাগে এক সংবাদ সম্মেলনে
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও পুলিশের কাউন্টার
টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের
প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মনিরুল ইসলাম জানান, চলতি
বছরের ১৯ মে ব্লগার ও প্রকাশক হত্যায় জড়িত
শরীফ, সেলিম, সিফাত, রাজু, সিহাব ও সাজ্জাদ নামে
ছয় জঙ্গীর ছবি প্রকাশ করা হয়। এরমধ্যে শরীফ
ও সেলিমকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ আর অন্যদের
ধরিয়ে দিতে দুই লাখ করে মোট ১৮ লাখ টাকা
পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এরমধ্যে শরীফ
গ্রেফতার হয়ে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।
টঙ্গী থেকে গ্রেফতারকৃত সিফাতকে ধরিয়ে
দিতে দুই লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
পুরস্কারের টাকা তথ্যদাতাকে গোপনে দেয়া
হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সিফাত প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই দীপন
হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। সে
দীপন হত্যাকা-ে জড়িত এবিটির সদস্যদের প্রশিক্ষণ
ও পরিচালনার সার্বিক দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল।সে
মোহাম্মদপুরে নবোদয় হাউজিংয়ে আনসারুল্লাহ বাংলা
টিমের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে
বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে।
দীপনকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের পাঁচ সদস্যের
একটি সিøপার সেল হত্যা করে। গ্রেফতারকৃত সিফাত
সরেজমিনে উপস্থিত থেকে হত্যাকা- সংঘটিত করায়।
জঙ্গীদের হাতে নিহত লেখক অভিজিত রায়ের
লেখা বই প্রকাশ করায় দীপনকে হত্যা করা হয়।
সিফাতের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানাধীন
মাধবপুর গ্রামে। সিলেট মদন মোহন কলেজে
বিবিএ’র ছাত্র ছিল। সিফাত ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়
আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে যোগদান করে। এর আগে
২০১২-২০১৩ সালের দিকে সে নিষিদ্ধ জঙ্গী
সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে জড়িত ছিল।
সিলেটে হিযবুত তাহরীরের কার্যক্রম চালানোর
সময় পোস্টারসহ ধরা পড়েছিল পুলিশের হাতে। তার
বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা রয়েছে।
জামিনে বেরিয়ে আবার সে জঙ্গীবাদে জড়িয়ে
পড়ে। কলেজে পড়াকালীন আনসারুল্লাহ বাংলা
টিমের এক সদস্যের মাধ্যমে দাওয়াত পেয়ে
জঙ্গী সংগঠনটিতে যোগ দেয়।
গত বছরের ৩১ অক্টোবর দুপুরে রাজধানীর
শাহবাগ থানাধীন আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয়
তলায় ১৩১ নম্বর জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ফয়সাল
আরেফিন দীপনকে (৪০) ঘাড় ও গলা কেটে হত্যা
করে। দীপন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের
অধ্যাপক ও লেখক ড. আবুল কাসেম ফজলুল
হকের একমাত্র ছেলে ছিলেন।
প্রকাশনা সংস্থাটি থেকে গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে হত্যাকা-ের শিকার হওয়া
মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক
বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক
প্রকৌশলী ড. অভিজিত রায়ের লেখা ‘বিশ্বাসের
ভাইরাস’ ও ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ নামের দুটি বই প্রকাশিত
হয়।
তদন্তকারী সূত্র বলছে, মহাখালীর ওই মারকাযে
শিহাব ও সিফাতসহ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের দুটি সেল
প্রশিক্ষণ নেয়। তাদের পুরস্কার ঘোষিত এবিটির
প্রশিক্ষক সেলিম ও শরীফ ট্রেনিং করায়। দীপন
হত্যাকারীদের প্রশিক্ষণ দেয় পুরস্কার ঘোষিত
জঙ্গী সেলিম। আর শুদ্ধস্বরে হামলার নেতৃত্ব
দেয় শরীফ।
এদিকে মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে বারোটায় র্যাব-১
গাজীপুর জেলার টঙ্গী থেকে জেএমবির
দক্ষিণাঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত আমির কানাডা ফেরত
রাশেদুজ্জামান রোজ (৩০), জেএমবি সদস্য মোঃ
সাহাবুদ্দিন ওরফে শিহাব ওরফে রকি (২৩) ও আহলে
হাদিসের নেতা মোহাম্মদ আব্দুল হাইকে (৩৬)
আটক করে।
র্যাবের লিগ্যাল এ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের পরিচালক
কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, গ্রেফতারকৃতদের
মধ্যে সাহাবুদ্দিন শোলাকিয়া হামলায় অংশগ্রহণকারী
শফিউলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। সে জেএমবির
সুইসাইডাল স্কোয়াডের সদস্য।
র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ
খান জানান, সম্প্রতি র্যাব-৪ জেএমবির মহিলা শাখার
নেত্রী আকলিমাকে গ্রেফতার করে। তার দেয়া
তথ্য মোতাবেক মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত
মৌ ও মেঘলা এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের
এক ইন্টার্ন মহিলা চিকিৎসক ঐশী গ্রেফতার হয়।
তাদের তথ্যমতে বেশ কয়েক জঙ্গী সদস্য ও
জঙ্গী প্রশিক্ষকের নাম পাওয়া যায়।
সেই তথ্যের সূত্র ধরে গ্রেফতার হয় জেএমবি
নেতা মাহমুদুল হাসান। আর মাহমুদুল হাসানের তথ্যমতে
গ্রেফতার হয় জেএমবি মহিলা শাখার প্রশিক্ষক
রাশেদুজ্জামান রোজের নাম। রোজ কানাডার
সেন্ট মারিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি
বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রী অর্জন করে।
২০০৬-২০১২ পর্যন্ত কানাডায় থাকাকালে তার সঙ্গে
মধ্যপ্রাচ্য ও সিরিয়ান কয়েক বন্ধুবান্ধবের সখ্য
গড়ে ওঠে। আর তাদের মাধ্যমেই জঙ্গীবাদে
জড়িয়ে পড়ে। পরে রোজ দেশে ফিরে
জেএমবির কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে।
তিনি আরও জানান, রাতে চট্টগ্রাম থেকে উত্তরায়
জেএমবির দুই সদস্য আসার কথা ছিল। তাদের
আটকের উদ্দেশেই এ অভিযান পরিচালিত হয়।
গ্রেফতারকৃত রাশেদুজ্জামান রোজ, আব্দুল হাই
চট্টগ্রাম ও সাহাবুদ্দিন পাবনা থেকে টঙ্গীতে
একত্রিত হয়ে নাশকতার জন্য বিস্ফোরকদ্রব্য
সংগ্রহের উদ্দেশে গাজীপুরে ফিরোজ ও
সাইফুলের কাছে যাচ্ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল
সাম্প্রতিক জঙ্গী সংগঠনের অস্তিত্ব জানান দিতে
নাশকতা চালানো।
তিনি জঙ্গীবাদের দায়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন
থেকে ২০১৪ সালে চাকরিচ্যুত হন। তিনি যশোর ও
ঝিনাইদহ এলাকায় বিভিন্ন সময় জেএমবির বৈঠক
আয়োজন করতেন।
সাহাবুদ্দিন শোলাকিয়া হামলায় অংশগ্রহণকারী শফিউলের
ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও জেএমবির আত্মঘাতী দলের
সদস্য। ২০১৩ সালে শফিউলের মাধ্যমে
জেএমবিতে যোগ দিয়ে দলের আত্মঘাতী
স্কোয়াডের অন্তর্ভুক্ত হয়। সে ইতোপূর্বে
জঙ্গী হামলার বিভিন্ন সরঞ্জাম ফিরোজের নিকট
থেকে সংগ্রহ করে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করত।
মোঃ ফিরোজ আহম্মেদ শেখ সিরাজগঞ্জের
মাহ্মুদুল হাসানের মাধ্যমে জেএমবিতে যোগ
দেয়। তিনি নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা
টিমের আধ্যাত্মিক নেতা মুফতি মাওলানা জসীমুদ্দিন
রাহমানির দোকানে প্রায় তিন মাস চাকরি করেন।
মোঃ সাইফুল ইসলাম ২০১০ সালে জেএমবিতে
যোগ দিয়ে ফিরোজের মাধ্যমে দীক্ষিত হয়।
মোবাইলের ফ্লেক্সিলোড, বিকাশসহ আতর, টুপির
ব্যবসা করে। তার মাধ্যমেই জেএমবির আর্থিক
লেনদেন হতো। ভুয়া নামে রেজিস্ট্রেশন
করে মোবাইল সিমকার্ড জেএমবি সদস্যদের
সরবরাহ করত।
0 মন্তব্য(গুলি):